কাটি ধান আটি, আটি সাজাই গাড়ি-সোনা ধান কাটিতে যাই।” গানের তালে তালে সোনার ধান কাটার এই আনন্দ ও উৎসবে মেতে উঠতে আশেপাশের গ্রাম তো বটেই, শহর থেকেও ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। নতুন ধান মাড়াই শেষে খামারের চিরচেনা উঠানে সুর মিলিয়ে ছোটরা মেতে ওঠে নবান্নের আবহমান রূপের সাথে। সকালের সোনালি রোদ আর কাজের ব্যস্ততা শেষে মাটির বুকে চট বিছিয়ে, কলাপাতার ছায়ায় বসে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নাস্তার আয়োজন। মুড়ি, চিড়া আর খাঁটি গুড়ের সাথে নতুন চালের নানা পদের সুবাসে সবাই যেন ফিরে যান নিজের শেকড়ে। পুরো সময়জুড়ে খামারের স্নিগ্ধ বাতাসে ভাসছিল গ্রামীণ মেঠো সুর। দেশি ধানের গান আর মাটিঘেঁষা সারি-সারি গানে চারপাশ মাতিয়ে তোলেন শিল্পীরা।
অগ্রহায়ণের প্রথম দিনে দেশি ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই আয়োজন করা হয় খামারে। দুপুর গড়িয়ে পড়তেই খামারের বিষমুক্ত শাকসবজি ও দেশি মাছ দিয়ে রান্না করা ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ির সুবাসে চারপাশ মৌ মৌ করে ওঠে। মাটির পাত্রে খিচুড়ি খাওয়ার আনন্দ ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।
দুপুরের তৃপ্তিদায়ক খাবারের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় কলাপাতায় হরেক রকমের পিঠা-পায়েসের সমাহার। নতুন চালের গুঁড়া আর গুড়ে তৈরি সেমাই পিঠা, পাটিসাপটা, সিদ্ধ পুলি, তিল পুলি, পাকান ও তেলের পিঠার গন্ধে চারপাশ হয়ে ওঠে মোহনীয়। সেখানে ধনী-গরিব বা জাতি-ধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিল না; সবাই পরম মমতায় একে অপরকে খাইয়ে দেন।
খামারের একপাশে চলমান দেশি বীজের প্রদর্শনী এবং লোকজ মেলা থেকে অনেকে সংগ্রহ করেন খাঁটি মধু সরিষার তেল ও মাটির তৈরি তৈজসপত্র। সার ও বিষমুক্ত এমন উৎসবে শিশুরা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি এসে মুক্ত পাখির মতো আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছিল।
কাস্তে হাতে ধান কাটা থেকে শুরু করে ঢেঁকিতে চাল ভাঙানো আর হরেক পিঠা-পায়েসের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে দেয়-বাঙালির প্রাণের নবান্ন উৎসব আর ঐতিহ্য আজও আমাদের হৃদয়ে কতটা জীবন্ত ও রঙিন। ঋতুচক্র ধরে প্রতিবছর এই খামারে বসে গ্রামীণ উৎসবের জমজমাট আসর। আনন্দময় এই মহামিলনকে কেন্দ্র করে খামারে উৎপাদিত বিষমুক্ত ফসলের প্রদর্শনী, লোকজ বিক্রয় কেন্দ্র এবং মৃৎশিল্পীদের হাতের তৈরি শিল্পকর্মের পসরা বসে। সেখান থেকে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা পরম আস্থায় নির্ভেজাল মধু খাঁটি সরিষার তেল এবং দেশি সুবাসিত চাল সংগ্রহ করেন। ঘর সাজাতে ও শেকড়ের টানে স্নেহের পরশে কেনা হয় মাটির তৈরি বৈচিত্র্যময় সব শৌখিন জিনিসপত্র।